সিজারের হার দিন দিন কেন বাড়ছে?

গাইনী প্রাকটিস করেন,অথচ ডাক্তারে কাছে গেলেই পেট কেটে ফেলে (সিজার)এই অপবাদ মাথায় নেন নি এমন ডাক্তার বাংলাদেশে একজনও নেই।সাধারণ মানুষ মনে করে সিজার মানে ডাক্তারের কারি কারি টাকা,আর ডাক্তাররা লোভে পড়ে রোগী ধরে আর সিজার করে।ঠিক যেন ছেলেখেলা।

সিজারের হার দিন দিন কেন বাড়ছে জানার আগে আসুন জেনে নেই কি জন্য সিজার লাগতে পারে তার কিছু কারণ-

ক)Absolute indication: মানে এসব ক্ষেত্রে কোন option নেই সিজার করাই লাগবে-
১বাচ্চা প্রসবের রাস্তা আনুপাতিকভাবে ছোট হলে।
২.মায়ের প্রেসার অর্থাৎ রক্তচাপ যদি অনেক বেশী থাকে (কোন ঔষধে কমছে না)।আবার সাথে খিঁচুনী মানে একলামশিয়া হলে।
৩.পেটের ভিতর বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হলে।
৪.ডেলিভারীর সময় সবার আগে বাচ্চার নাড়ী দেখা গেলে।
৫.গর্ভফুল যদি জরায়ুর মুখে থাকে।(গ্রেড-৩,৪)
৬.বাচ্চা ডেলিভারীর পূর্বেই যদি গর্ভফুল জরায়ুর গা থেকে ছোটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
৭.বাচ্চা যদি জরায়ুতে আড়াআড়িভাবে থাকে। বাচ্চা উল্টো থাকলে ( বেশীরভাগ সময়)।
৮.ডেলিভারীর সময় যদি জরায়ু ফেটে যায়।
৯.বাচ্চা প্রসবের রাস্তায় যদি বড় কোন টিউমার কিংবা মাংসের টুকরা থাকে।
১০.আগে যদি VVF এর অপারেশন হয়ে থাকে।( VVF-vesico-vaginal fistula)

খ)Relative indication: মানে সবদিক বিবেচনা করে সিজার করলে সবচেয়ে ভাল হবে এমন কারণ-
১.জরায়ুতে একসাথে একের অধিক বাচ্চা থাকলে।
২.বাচ্চার মাথা বড় হলে।( রোগ ছাড়া এটা
স্বাভাবিকভাবে একটু বড় হলেও-BPD দেখে)
৩.আগের বাচ্চা সিজারে হলে।
৪.ডেলিভারীর ব্যাথা শুরু হওয়ার আগে যে কোন পরিমাণ রক্তক্ষরণ শুরু হলে।
৫.মা যদি নিজ থেকে চান।
৬.সময় পার হয়ে যাওয়া পর ঔষধেও যদি ডেলিভারীর ব্যাথা না উঠে।
৭.মা যদি বেশী বয়সে প্রথম গর্ভবতী হোন।
৮.বাচ্চা জরায়ুতে যে পানিতে থাকে তা কমে গেলে।
৯.বাচ্চা ডেলিভারীর সম্ভাব্য তারিখ থেকে বেশী দেরি করে আসলে।

বইপত্রে সিজার করার আরো অনেক কারণ দেয়া আছে,আমি শুধু কমনগুলো বললাম।কিছু কমন কারণ হয়তো ভুলে বাদও পড়তে পারে।এখন আসেন কেন সিজারের হার বাড়ছে সেটা দেখাই-

১. আগে ডাক্তারের কাছে আসতেন না কোন পরীক্ষাও লাগতো না।এখন যখন ডাক্তারের কাছে এসে নিদানপক্ষে একটা আলট্রাসনোগ্রাফী করান তখন অনেক কিছুই ধরা পরে- জরায়ুতে কয়টা বাচ্চা,গর্ভফুল কই আছে,বাচ্চার মাথা (BPD) বড় কিনা,বাচ্চার পজিশন ঠিক আছে কিনা,পেটের মধ্যে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা,বাচ্চা যে পানিতে আছে তার পরিমাণটা ঠিক আছে কি না।এসবের কোনটায় হেরফের দেখলে ডাক্তারকে নীতিগত ভাবেই সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

২.এখন যখন ডাক্তারের কাছে আসেন ডাক্তার তো প্রেসার চেক আপ করেই আপনার সমস্যাটা ধরতে পারেন- আপনার প্রেসার বেশী। আগের মানুষেরা হয়তো তা আমলেই নিতো না।ফলাফল,একলামশিয়া শব্দটা কিন্তু সেকেলে মা খালারাও বেশ জানে।ডাক্তার তো আর হাত গুটিয়ে বসে বসে এসবের কনসিক্যুয়েন্স দেখতে পারেন না!

৩.পড়াশুনা আর ক্যারিয়ার গড়তে গড়তে এখন অনেক মেয়েরই বাচ্চা নিতে দেরী হয়ে যায়।সিজারের হার বাড়ার এটাও একটা কারণ।

৪. কিছু কিছু বেশী বোঝদার রোগীতো আসে ডেলিভারীর সম্ভাব্য তারিখের অনেক পরে যাদের জন্য আপনি মেডিকেল ট্রায়াল মানে ঔষধ দিয়ে প্রসব ব্যাথা উঠানোর জন্য বেশী সময় অপেক্ষা করতে পারবেন না। আর এমনিতে সময় পার করে আসার কারণে বাচ্চা যে পানিতে থাকে তাও কমে যায়।ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ডাক্তারকে সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

৫. এখন বন্ধ্যাত্বের সংখ্যা বাড়ার কারণে চিকিৎসায় ovulation inducing drug বেশী ব্যবহার করা হচ্ছে যার ফলে অনেক মায়েরই এখন একসাথে একের অধিক সন্তান গর্ভে আসছে ফলশ্রুতিতে সিজারের হার বাড়ছে।

৬.আগের মায়েদের মাঝে সচেতনতা কম ছিল তাই ঘন ঘন গর্ভধারন করতো আর প্রসবের সময় সন্তানের ঝুঁকি নিয়ে এত মাথা ঘামাতো না কিন্তু এখনকার মায়েরা অনেক সচেতন -প্রসবকালীন জটিলতা এড়াতে স্বেচ্ছায়ই অনেকে সিজার করাতে ডাক্তারকে অনুরোধ করেন।

৭.সর্বোপরি,টারশিয়ারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ডেলিভারীর বেশিরভাগ রোগীগুলো আসেই বাসায়,উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারীর চেষ্টা করে সুতরাং এই লেভেলে আসার পর ডাক্তারদের হাতে সিজার ছাড়া বেশীরভাগ সময়ই কোন অপশন থাকে না।

৮.একটি বাচ্চা সিজারে হওয়ার পর পরবর্তী বাচ্চার ক্ষেত্রে সিজার করাই যেহেতু বেশী নিরাপদ সেহেতু সিজার নিজেই সিজারের হার বৃদ্ধির একটি কারণ।

আসলে আরো অনেক কারণ আছে।এত বড় লেখা এমনিতেই কেউ পড়তে চায় না আরো কিছু লেখলে আমার লেখাটাই হয়তো বেকার যাবে তাই আর বিস্তারিত লিখলাম না।

সিজার করায় আপনি বলেন লোভী ডাক্তার আর এই লোভী ডাক্তার আপনার রোগীটাকে নিয়ে মাথায় অনেক অংক কষে একটা সিদ্ধান্তে আসে কোন মুডে ডেলিভারী করাবে- নরমাল না সিজার।মজার ব্যাপার কি জানেন,আপনার পীড়াপীড়েতে কোন ডাক্তার এত কিছু মাথায় রেখে যদি কখনও সিজারের জায়গায় নরমাল ডেলিভারীর চেষ্টা করার আগে আপনাকে শুধু বলেন-“ঠিক আছে আমি চেষ্টা করতে পারি কিন্তু রিস্ক আপনার।”আপনার মুখটা তখন কাচুমাচু হয়ে আসে, তখন ঠিকই বলেন আপনি যা ভাল মনে করেন।আপনি আপনার রোগীর রিস্ক নিতে চান না অথচ আপনি চান আমরা যাতে এত বিপদ জেনেও আপনার রোগীর রিস্ক নেই। তারপর আল্লাহ না করুক কোন অঘটন ঘটলে আপনি হাসপাতাল ভাঙ্গেন,পত্রিকায় ফলাও করে খবর করেন,আমার বিরুদ্ধে মামলা দেন।
আমি বলি না সব ডাক্তার শতভাগ সৎ কিন্তু যারা এটা করে তাদের সংখ্যা নেহাতই নগন্য।আর একটা ভুল ধারণা ভাঙ্গা খুব জরুরী। সিজার মানে যে মনে করেন ডাক্তারের কারি কারি টাকা এটা একটা অমূলক ধারণা।ক্লিনিকে সিজার করিয়ে যে বিলটা দিয়ে আসেন তার একটা খুব সামান্য অংশই সার্জন পান আর তার এসিস্টেন্ট যা পান সেটা শুনলে আপনিও দুঃখিত হবেন।আর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তো বেতনের বাইরে আপনার রোগীর সিজারের জন্য চিকিৎসককে একটা টাকাও এক্সট্রা দেওয়া হয় না।

একটু ভেবে বলুন তো,আপনার দাদীর যতগুলো বাচ্চা মারা গেছে শুনেছেন কিংবা বাচ্চা প্রসবের সময় বা প্রসবের পর প্রসবজনিত জটিলতায় আগে যত মা মারা গেছে শুনতেন এখন আর তেমনটা শুনেন নাকি?সিজারের হার বাড়ার জন্য ডাক্তারকে যেই হারে লানত দিচ্ছেন,মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমানোর জন্য যদি সেই পরিমাণ দোয়া দেন তবে আশা করি ডাক্তাররা খালি এই দোয়াতেই শেষ বিচার দিবসে অনেকখানি উতরে যাবে( ইনশাল্লাহ)……………

Dr.Sayeda Islam
Sylhet Women’s Medical College & Hospital.
Session:2005-2006.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *