কিশোররা কী চেয়েছিল আর বুড়োরা কী দিলেন…

নিরাপদ সড়কের দাবিতে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী রাস্তায় নেমে এলো। বাংলাদেশে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যেন বাগানের চারাগাছগুলো দলে দলে রাস্তায় নেমে আসছে। কিন্তু কী চেয়েছিল তারা আর কী পেয়েছে? এই চাওয়া-পাওয়া ও না-পাওয়ার হিসাবের খেরোখাতার ভবিষ্যৎই বা কী? সম্প্রতি ঢাকার কিশোর বিদ্রোহ ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন

শিরোনামটাকে একেবারে আক্ষরিকভাবে নেওয়ার দরকার নেই। কেননা যারা প্রত্যক্ষভাবে হামলা চালিয়েছিল, তারাও বয়সে অনেকে তরুণই ছিল। আবার জেগে ওঠা কিশোরদের পক্ষে দাঁড়িয়ে হামলা-মামলা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেক বয়স্করাও। ফলে তারুণ্যকে শুধু বয়স দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়েও বুঝতে হবে। যে কিশোররা রাস্তায় নেমেছিল, তারা এখানকার জীর্ণ, পুরনো অভ্যস্ততাকে ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল, ফলে আকাঙ্ক্ষায়ও তারা নবীন, তরুণ, জীবন্ত। তাদের পক্ষে, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে যে বয়স্করা নেমেছেন, তাঁরাও নতুনের পক্ষে, জীবনের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। আর আক্রমণকারী তরুণরা নেমেছেন পুরনো, নিপীড়ক ব্যবস্থাকে রক্ষায়, আর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বয়স্কদের নির্দেশেই।

এই যে হাজারে হাজারে কিশোর স্কুলড্রেস পরে রাস্তায় নেমে  এলো, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য বাংলাদেশে। যেন বাগানের চারা গাছেরা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসছে। কী চেয়েছিল তারা? নিজে নিজে কল্পনা না করে বরং তাদের স্লোগান, কথা থেকেই আসুন জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, তারপর না হয় তার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা যাবে। এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত দাবি ছিল—নিরাপদ সড়ক চাই, ন্যায়বিচার চাই, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। কিন্তু এখানেই তাদের দাবি, প্রশ্ন, স্লোগান থেমে থাকেনি। তারা এগুলোকে নানা ভাষায় প্রকাশ করেছে তো বটেই, অন্য নানা বিষয়ও তারা তুলে ধরেছে। তারা স্লোগান দিয়েছে—‘৪৭ বছরের রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ ‘ঘুষখোর পুলিশ চাই না।’ ‘জনপ্রতিধিদের অন্তত তিন দিন গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হবে।’ ‘গণপরিবহনে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ চাই।’ ‘যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের গাড়ির লাইসেন্সের ডেট ফেল কেন?’ ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলে গাড়ি আটকান, আমরা গাড়ি আটকাই না।’ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই না, নিরাপদ বাংলাদেশ চাই।’ ‘এত জিপিএ ৫ দিয়ে কী হবে, একদিন তো বাসের তলায়ই পড়তে হবে।’ ‘৯ টাকায় ১ জিবি ডাটা নয়, নিরাপদ সড়ক চাই।’ এমনকি তারা প্রশ্ন তুলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী, লাইসেন্স কই?’ আর তাদের এই আন্দোলনের প্রক্রিয়ায়ই রচিত হয়েছে এমন এক স্লোগান, যা হয়ে উঠেছে সময়ের মহত্তম কবিতা— ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তুমি বাংলাদেশ।’  আর তারা শুধু স্লোগান তুলেই ক্ষান্ত হয়নি, কাজটা করে দেখিয়ে দিতে চেয়েছে। ওরা রাস্তায় গাড়ির লাইসেন্স চেক করেছে, মন্ত্রীর গাড়ি রাস্তার উল্টো পথ থেকে ঘুরিয়ে সোজা পথে ফিরিয়ে দিয়েছে, পুলিশের গাড়ির লাইসেন্স চেক করেছে। সেলিব্রিটি, নিজের মা-বাবা—কেউই ছাড় পায়নি। ঢাকার রাস্তায় সারি বাঁধা গাড়ি, ইমার্জেন্সি লেনের বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। তারা নাগরিকদের মধ্যে ভেদাভেদবিহীনভাবে আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তাদের এই কার্যক্রম মানুষ কিভাবে গ্রহণ করেছে, সেটি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, মানুষ হাসিমুখে তাদের এই কর্তৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছে। এমনকি সেনা সদস্যদেরও হাসিমুখে সেটি মেনে নিতে দেখা গেছে। বহুজন খাবার, পানি নিয়ে এই কিশোরদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। অনেককেই দেখেছি গাড়ির লাইসেন্স ঠিক নেই, ডেট শেষ হয়ে গেছে ফিটনেস সার্টিফিকেটের বা এ রকম কোনো কারণে গাড়ি বেরই করেননি, পাছে বাচ্চাগুলোর কাছে লজ্জা পেতে হয়। অথচ এই আন্দোলনের ওপর আক্রমণ করে, ভয় দেখিয়ে নির্মমভাবে তা বন্ধ করে দেওয়ার পর সরকার পুলিশ সপ্তাহ চালু করে, তাকে আরো এক সপ্তাহ বর্ধিতও করে। তাতে বহুজনকে জরিমানাও করা হয়, কিন্তু এর কোনো কিছুই তেমন কোনো ফল দেয়নি। যার সরল অর্থ দাঁড়ায়—মানুষ আইন প্রয়োগকারী হিসেবে এই জাগ্রত কিশোরদের যেভাবে ভালোবাসা, সম্মান আর আস্থায় নিয়েছে, তা রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সেই আস্থায় নেয়নি। এই নিষ্পাপ কিশোরদের কাছে লজ্জা পাওয়ার আছে, কিন্তু ঘুষখোর পুলিশকে লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ কি আছে? আসলে যখন গোটা বাংলাদেশকেই ভয় দেখিয়ে, নানা সুবিধা দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে, তখন ভয়কে জয় করা এসব ভয়ভীতি আর সুবিধার বাইরে সমাজের সবচেয়ে নিষ্পাপ অংশই রুখে দাঁড়িয়েছে। জীবনের দাবি নিয়ে, প্রাণের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে। হাজারে হাজারে, কাতারে কাতারে। বাংলাদেশের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে তারা। আমি, তুমি, আমরা যখন রুখে দাঁড়াই—তখন আমরাই বাংলাদেশ। যারা ভয় দেখায়, যারা মেরে ফেলে, মানুষের মৃত্যুতে যারা দাঁত কেলিয়ে হাসে, এটাকে জায়েজ করতে নানা ভেক ধরে, তারা বাংলাদেশ নয়। এই আন্দোলন আমাদের আশা জাগায়—বাংলাদেশে নতুন একটা ইতিহাস রচিত হতে চলেছে, আর তা এই কিশোরদের হাত ধরে।

ইতিহাস কখনো থামে না, ইতিহাস নিরন্তর বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। স্কুলড্রেস পরে রাস্তায় নেমে আসা এই কিশোররাই ইতিহাসের নতুন কাণ্ডারি। আসলে এগুলোর মাধ্যমে ওরা ওদের বাংলাদেশত্বকেই হাজির করছে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার তলায় যেভাবে এ দেশের মানুষ তাদের নাগরিক অধিকার হারায়, তার অবসান দাবি করেছে কিশোররা। ওরা দাবি তুলেছে ন্যায়বিচারের—‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ আসলে দেশের নাগরিক, তার আসল মালিক হিসেবে তার দাবিকে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অধিকার, তার কর্তাসত্তাকে সে ফেরত চাইছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে তারা তার প্রকাশ করেছে। আর এই নাগরিক মর্যাদা, তার কর্তাসত্তা থেকে রাষ্ট্র তাকে বঞ্চিত করেছে, করে যাচ্ছে। এই অধিকার ফেরত চাওয়াকে তারা রীতিমতো একটা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

রাষ্ট্র তার পক্ষপাত খোলাখুলি প্রকাশ করে ফেলেছে আক্রমণকারীদের শাস্তি না দিয়ে, বরং আক্রান্তদেরই গ্রেপ্তার করে। তাদের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের নানাভাবে হেনস্তা করে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে এখনো গ্রেপ্তার রাখা হয়েছে, ছাত্রনেতা মারুফকেও এখনো ছাড়া হয়নি। আর আন্দোলনের পরই শুরু হয়ে গেছে আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক সংযোগ খোঁজার। যদিও সেটি পাওয়া যায়নি; কিন্তু গোটা ব্যাপারটার মধ্যেই এমন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে রাজনীতিসংশ্লিষ্টতা নিজে নিজেই একটা বিশাল অপরাধ। জনগণ সরকারি দল ছাড়া অন্য কোনো দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অধিকার রাখে না। যেন বা রাষ্ট্র হবে রাজনীতিমুক্ত, জনগণের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। বিদ্রোহী কিশোরদের ওপর হেলমেট বাহিনী দিয়ে আক্রমণই হলো সঠিক ধারার রাজনীতি, এর বাইরে বাকি সবটা হলো অপরাধ।

এই আন্দোলনে আরেকটি বিশেষ বিষয় ছিল স্লোগানের অভিনবত্ব। এই কিশোররা যে আন্তর্জাতিক নানা সংগ্রাম, চিন্তার নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন বা হচ্ছেন—সেটিও এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় সদ্যঃকৈশোর পেরোনো একজন অ্যানোনিমাস আন্দোলনকারীর দেখা মিলেছে এই আন্দোলনে। ‘তুই আমারে চেনছ’-এর জমিদারি কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অপরিচিত, সাধারণ হওয়ার অধিকার পাওয়ার এই দাবি বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকেই প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে নানামুখী সহজ অথচ অন্তর্ভেদী সব স্লোগান আবিষ্কার করেছে এই কিশোররা। যদিও মোট স্লোগানের তুলনায় তা সংখ্যায় নগণ্য, তবু দেখা যাবে, তারা সেখানে খিস্তিও ব্যবহার করেছে। সেটিকেই বড় করে তুলে এই আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছে সরকারি বুদ্ধিজীবীকুল। অথচ প্রতিনিয়ত যে রাষ্ট্র তাকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে, তাকে অবদমিত করে রাখছে, তাকে কাঠামোগত বা সরাসরি খুনের শিকার করছে, তার বিরুদ্ধে তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে তারা স্লোগানে স্লোগানে। রাষ্ট্রের ভয় দেখানোর যন্ত্রটাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেই তারা গালি ব্যবহার করছে। যে লাঠির ভয় তাদের দেখানো হয়, তাকে উল্টো ‘ভরে’ দেওয়ার স্লোগান তারা দিয়েছে, যে পুলিশ দিয়ে তাদের মার খাওয়ানো হচ্ছে, তাদের তারা ‘চ্যাটের বাল’ আখ্যা দিচ্ছে। হুমকিকে থোড়াই পরোয়া করার বেপরোয়া সাহসের এই প্রকাশ এত সহজে আর কোনোভাবে করা যেত বলে মনে হয় না। কিন্তু খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে, এর কোনোটাই অন্যের প্রতি ফ্যাসিস্ট আক্রমণের ভাষা নয়; বরং তার ওপর চলে আসা নির্যাতনের প্রতিবাদমাত্র। ‘একটা-দুইটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’—এর মতো ফ্যাসিস্ট স্লোগান তারা দেয়নি। তারা শুধু রাষ্ট্রের ভয় দেখানোকেই প্রত্যাখ্যান করেনি, তথাকথিত উন্নয়নের চটককেও প্রত্যাখ্যান করেছে। আবার এই ছাত্ররাই ধানমণ্ডিতে রাস্তার কাচ পরিষ্কার করেছে, যাতে পথচারীরা আহত না হয়। সায়েন্সল্যাবে তাদের বাধা দিতে আসা পুলিশদের সবাইকে ফুল দিয়ে বরণ করে সহনশীলতার প্রকাশ ঘটিয়ে তাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। তারা ঢাকা শহরের পরিবহন নিয়ে যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সমাধান হাজির করেছে, তার আলোকে ঢাকার যানজট ও পরিবহন সমস্যারও সমাধান সম্ভব।

অর্থাৎ এই আন্দোলনের মেসেজটা পরিষ্কার। নিজের অবদমন, আর ভয়কে জয় করো, জীবনের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়াও। ঢাকঢোল পেটানো উন্নয়নের চেয়ে জীবন গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার হরণ চলবে না। আমি, আপনি, আমরাই বাংলাদেশ, আমরাই ঠিক করব এ দেশ কিভাবে চলবে। সে জন্য রাস্তায় নামতে হবে, সক্রিয় হতে হবে। আর এই পথটা আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ, তার ঘোষণার অঙ্গীকার। এই পথ গোটা বাংলাদেশের সামনে স্পষ্ট করেছে এই কিশোররা, তারা এই পথের দিশারি। বুড়োরা ভয় পায়, তাই ভয় দেখায় এবং সেই ভয় সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু শত শত পুলিশের সামনে একজন বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো কিশোর আমাদের সাহস জোগায়। আর জনতার শক্তি একত্র হলে একটা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সড়কে যেমন সম্ভব, গোটা দেশেও সম্ভব—সেই আস্থা জোগায় সবার মনে। আজ তারা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে, আর গোটা বাংলাদেশকে আহ্বান জানাচ্ছে দেশ পরিচালনার লাইসেন্স চেক করার। বড়রা তাতে ব্যর্থ হলে আজ না হোক কাল এই কিশোররাই তা করে দেখাবে। আজকের এই লড়াই তাদের ভেতর একটা দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে নিঃসন্দেহেই। একটা আপাতপরাজয় নতুন বিজয়ের পথ তৈরি করবে। জেগে ওঠা কিশোর, তরুণদের অভিনন্দন। তারাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

রাস্তায় নেমে আসা এই কিশোররাই ইতিহাসের নতুন কাণ্ডারি

ঢাকার রাস্তায় সার বাঁধা গাড়ি। তারা নাগরিকদের মধ্যে ভেদাভেদবিহীনভাবে আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে

আন্দোলন-পরবর্তী চিত্র। কার্যত কোনো পরিবর্তন নেই। রাজধানীজুড়ে সেই পূর্বাবস্থার পুনরাবৃত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *