আফগানিস্তানের কাছে যে কারনে হার মানতে হল যুক্তরাষ্ট্রকে

প্রবল শক্তিমত্তায় সবকিছু গুঁড়িয়ে দেয়ার দম্ভ নিয়ে আফগানিস্তানে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দীর্ঘ ১৭টি বছর একটানা লড়াই করে জয়ের মুখ দেখা তো দূরের কথা, পরাজয় ঠেকাতেও এখন হিমশিম খাচ্ছে। যে আফগানিস্তানে একসময় ব্রিটিশ রাজ্যের পরাজয় ঘটেছিল, যেখানে হারের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল আর সেখানে বর্তমানে এখনকার দুনিয়ার একমাত্র পরাশক্তির ইতিহাসে পরিণত হওয়ার পালা। সেটা বুঝতে পেরেই যেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সম্মানজনক বিদায় নিতে চাইছেন দেশটি থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপে বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে।

তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামো নির্মাণ করেছিল সেটিই এখন সমূলে নড়ে উঠেছে। মনে রাখতে হবে, এই কাঠামোর পতন যুদ্ধের স্রেফ একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়, বরং এর অর্থ আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামরিক পরাজয়। এ কাঠামোটি আফগানিস্তানে তালেবানের শক্তি-কাঠামাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার জন্য নির্মিত হয়েছিল।
তালেবান শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ও সম্প্রসারণই করেনি, তারা তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা ও এমনকি পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পরিচালনায় আরো শক্তিশালী হয়েছে।

আফগান অ্যানালিস্ট নেটওয়ার্কের (এএনএন) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জেলা নিয়ন্ত্রণ করছে তালেবান। তারা এসব এলাকায় নিজস্ব গভর্নর ও পুলিশপ্রধান নিয়োগ করছে; স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, মিডিয়া, টেলিকমিউনিকেশন, দ্রুত বিচার করার ব্যবস্থার মতো বিষয়ে সরাসরি প্রশাসনিক বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা করছে। এএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগান কর্মকর্তারা পর্যন্ত তালেবানের পাশাপাশি কাজ করছে।

তালেবানের প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ দেখা না যাওয়ার কারণ হলো- জনগণ কারজাই ও গনি উভয় প্রশাসনের কাজে সন্তুষ্ট ছিল না।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার জনগণের কাছে দেয়া তার প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে পারেনি। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দায়িত্বহীন সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে নিরস্ত্র করবে, হেরাত-ওবেহ-চেস্ত-ই শরিফ রাস্তা নির্মাণ করবে, বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবে, দুর্নীতির অবসান ঘটাবে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। কারজাই ও গনি উভয় প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ঘটনায় জনগণ ক্ষুব্ধ। আর এর জের ধরে লোকজন তালেবানের বার্তায় আকৃষ্ট হয়েছে, সাড়া দিয়েছে। তালেবান জনসাধারণকে বলেছে, আমাদের দেশ বিদেশীরা দখল করে উপনিবেশ বানিয়েছে… তারা লোকজনকে সরকারের ভেতরের বিভক্তির কথা বলেছে, এতে থাকা দুর্নীতির কথা বলেছে।
এর ফলে তালেবান জেলা থেকে প্রাদেশিকপর্যায়ে তাদের নিজস্ব ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। তাদের নিযুক্ত কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত পদস্থদের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করে।
এএনএন প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান সদস্যদের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। তারা তাদের তালেবান প্রাদেশিক প্রশাসনে তাদের ঊর্ধ্বতনদের কাছে রিপোর্ট করে।

তালেবান তাদের নিজস্ব ধরনের রাজস্ব ও কর ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা টিকে থাকার জন্য তাদের নিজস্ব আর্থিক উৎসের ভিত্তি গড়েছে। তারা ফসলি জমিতে উশর কর ধার্য করে, রাস্তা ও সেতু ইত্যাদির মতো প্রকল্পও হাতে নিচ্ছে। তারা জাকাত করও আদায় করে থাকে।

তালেবানের পক্ষে এসব করা সম্ভব হয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা লোকজনের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে তারা স্থানীয় জনসাধারণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। বিশেষ করে প্রবীণ ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে তারা বসে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলো হয় মসজিদে।
অনেক এলাকায় তারা ২০০৯ সাল থেকে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। অথচ ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবেই মার্কিন শক্তি ছিল সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। তারা দাবি করে, ওই সময় তালেবানকে রুখে দেয়ার শক্তি তাদের ছিল।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, তারা তা পারেনি। এমনকি বর্তমানে আফগানিস্তানে তালেবান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে অচলাবস্থা রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি করছে, সেটিই ধোপে টেকে না। সামরিক ক্ষেত্রে হয়তো অচলাবস্থা রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তা বলা যায় না।
এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির খুব বেশি পার্থক্য ঘটছে না। মার্কিন সৈন্য সংখ্যা এক লাখের চেয়ে কম হয়ে গেলেও লড়াইয়ের তীব্রতা হ্রাস পায়নি। ২০১৮ সালে মার্কিন বিমানবাহিনী ১৭ বছর ধরে চলা যুদ্ধের যেকোনো বছরের চেয়ে অনেক বেশি বোমা ফেলেছে।
কিন্তু বিমান শক্তি ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং তালেবান কেবল ভূখণ্ডগতভাবেই নয়, সেই সাথে রাজনৈতিকভাবেই শক্তি অর্জন করেছে।

অর্থাৎ মার্কিন সামরিকবাহিনী আফগানিস্তান থেকে তালেবান শক্তিতে গুঁড়িয়ে দেয়া ও ধ্বংস করার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
আফগানিস্তানে মার্কিন রাজনৈতিক-সামরিক কাঠামোর আরেকটি স্তম্ভ আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থাও ভিন্ন নয়। সরকার প্রতি বছর যত নতুন সদস্য ভর্তি করছে, তালেবান পক্ষ সরকারি বাহিনীর তার চেয়ে বেশি সদস্যকে হত্যা করছে। মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৫ সালে মারা গিয়েছিল পাঁচ হাজার ৫০০, ২০১৬ সালে ছয় হাজার ৭০০, ২০১৭ সালে ১০ হাজার এবং ২০১৮ সালে এর ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

অর্থাৎ মার্কিন রাজনৈতিক-সামরিক সৌধটি তার মাথার ওপরই ভেঙে পড়ছে। আফগানিস্তানে মার্কিনবাহিনীর আসন্ন পরাজয় নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ নেই। মার্কিন কর্মকর্তারা অব্যাহতভাবে পরিস্থিতিকে অচলাবস্থা হিসেবে বলে যেতে পারেন, কিন্তু তারা তালেবানকে তাদের দাবি গ্রহণ করতে চাপ দিতে পারছে না, বিশেষ করে আফগানিস্তানে মার্কিন ঘাঁটি বহাল রাখার বিষয়টি তাদেরকে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারছে না।

মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভবত বাস্তবতা বুঝতে পেরেছেন। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনাসদস্যের বড় ধরনের হ্রাস করতে চাচ্ছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে বর্তমানে থাকা ১৪ হাজার সৈন্যের প্রায় ৫০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে শুরু করবে বলে মার্কিন মিডিয়ায় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা যদিও বলছেন, এটি হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্ঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ, কিন্তু প্রশ্ন হলো- এটি কি কেবলই প্রচারণার প্রতিশ্রুতির ফল? আসলে আফগানিস্তানে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের ফলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। যেটা অনিবার্য বলে মনে হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের জন্য এমনটি করা হচ্ছে না, বরং বিপর্যয় যাতে কম লজ্জাজনক হয় এবং আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটেছে, এমনটি যাতে দাবি করা যায়, সে জন্যই এই পদক্ষেপ।
কিন্তু সেটিও কি করতে পারবেন ট্রাম্প? রাশিয়া ও চীন যেভাবে ছক কষছে, তাতে করে আরেকটি ভিয়েতনামই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *